কার ভালো লাগে বলুন তো স্যার, প্রতি রাতে একটা অনুভূতিহীন সহবাস করার জন্য। কিন্তু তাও আমাদের করতে হয়, পেটের জ্বালায়। 

এতক্ষন কথাগুলো বলে মেয়েটি থামে। 

সম্রাট এতক্ষন কথাগুলো শুনে মনে মনে বলে ,----ও যা বলছে সব ঠিক বলছে। একটাও মিথ্যে নয়। এদের তো ভদ্র সমাজ জন্ম দেয়।

সম্রাট মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,-----তোমার নাম কি?? কোথায় থাকো?

কেন স্যার, আপনি আমার বাড়িতে যাবেন নাকি?একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে। 

সম্রাট শান্ত ভাবে বলে,---- যা জানতে চাইছি সেটা বলো। 

রাকা, আমার নাম বাড়ি বনগাঁও। 

রোজ শহরে আসো তুমি?

না রোজ না, যেদিন ভালো কাস্টমার পাই। তারাই আমাকে আসতে বলে। নয়তো আমি লোকালে করি। শালা আজ প্রথম এলাম আর আজ ফেঁসে গেলাম দূর, বাড়িতে ভাই বোন টা একা কি করবে কে জানে। 

তোমার ভাই বোন পড়াশোনা করে?

হ্যাঁ করে, ভাই 8 টে পরে, আর বোনটা এবার মাধ্যমিক দেবে, খুব ভালো পড়াশোনায় দুজনেই। ভাবুক হয়ে বলে রাকা। 

আচ্ছা তোমার ভাই বোন যখন জানতে পারবে, যে তুমি কিভাবে রোজগার করছো তখন ওরা তোমাকে ক্ষমা করবে? তোমার কি মনে হয়। এই কথাটা বলেই  সম্রাট ওর দিকে তাকায়। 

রাকা বলে,----ওরা কি করে জানতে পারবে? এই আপনি ওদের বলে দেবেন না তো। এই জন্যই আমার সব কিছু জানতে চাইছিলেন তাই তো। দেখুন আমি বলে দিচ্ছি, আমার ভাই বোন কে এখানে টানবেন না। ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কথাটা বলে রাকা। 

আমার কথার উত্তর কিন্তু দিলে না রাকা। 

কি উত্তর শুনতে চাইছেন আপনি? হ্যাঁ সবার মতোই ওরাও আমাকে ঘেন্না করবে। তাই তো এত দূরে আসছি। যাতে ওরা জানতে না পারে। 

তাহলে ছেড়ে কেন দিচ্ছ না এসব। রাকার চোখে চোখ রেখে বলে সম্রাট।

আমি ছেড়ে দিলে ওদের মানুষ করবো কি করে?  

রাকা তুমি এখানে কিভাবে এলে?

স্যার আমি এরকম ছিলাম না, আমার নাম রুকিনী ধর। সেখান থেকে হয়ে গেছি রাকা।

আমিও আমার বাবা মা ভাই বোনদের সাথে বেশ ভালোই ছিলাম আমার গ্রামে। 

বাবা একটা কারখানায় কাজ করতো। তখন আমার বয়স ১৫, সবে মাধ্যমিক দিয়েছি। আমার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে টিচার হবার। 

একদিন হঠাৎ খবর পেলাম বাবার কারখানায় একসিডেন্ট হয়েছে। আমরা সবাই ছুটে যাই। কিন্তু বাবা ততক্ষনে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পরলোকে। 

এই পর দুমাস কেটে যায়। কারখানা থেকে বলে ছিল কিছু টাকা দেবে, কিন্তু এতগুলো দিন কেটে যায় সেখান থেকে কোনো খবর আসে না। মা বাধ্য হয়ে তিন চার বাড়ি রান্নার কাজ করতো। তাতেই আমাদের কোনো রকমে চলতো। কিন্তু আমার  পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। মাধ্যমিক এ ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছিলাম কিন্তু  আর পড়াশোনা হলো না।

একদিন মা কারখানায় যায় টাকার জন্য। কিন্তু মাও আর ফিরে আসে না। আমি খোঁজ নিতে গেলে ওখানকার দারোয়ান বলে,----এনামে এখানে কেউ আসে নি। বলে আমাকে ঠেলে ফেলে দেয়। আর ঠিক তখন একটা গাড়ি এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। সেখান থেকে এক সুন্দর পোশাক পরে একজন মাঝ বয়সী লোক নেমে এসে আমার থেকে সব কিছু জানতে চায়। আমি সব কিছু বলাতে উনি আমাকে ওনার কেবিনে নিয়ে যায়।  

উনি আমাকে বলেন,-----তোমার বাবার সব টাকা আমি দেবার ব্যাবস্থা করে দেব, আর এতটাই দেব যে, যা তোমার কল্পনার অতীত। কিন্তু বদলে আমি কি পাবো?

আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম,---আমি গরিব আমার দেবার কিছু নেই। আর যদি কিছু থাকতো তো আমি দিতাম। 

লোকটি সামনে এসে আমার হাতে হাত রেখে বলে,----অনেক কিছু দেবার আছে। তুমি চাইলে অনেক কিছু দিতে পারো।

আমি বললাম পরিষ্কার করে বলুন। 

উনি তখন আমাকে বলল,----আমাকে মাঝে মাঝে ওনার সাথে ঘুরতে যেতে হবে, ওনার কথা শুনতে হবে। আর কথা বলার সময় উনি আমার শরীর স্পর্শ করতে চাইছিলেন। আমি ওনার মনবাসনা বুঝতে পেরে বলি,---আমার কিছু লাগবে না বলে আমি চলে আসব,তখন উনি আমার হাত ধরে বলে, কোনো তাড়াহুড়ো নেই আমি তোমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করব।

আমি উনাকে একটা ঠ্যালা দিয়ে ওখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসি।

তারপর আমি দুটো চারটে বাড়িতে ঘর মোছার আর বাসন মাজার কাজ নি। কারণ আমি তখন ভালো করে রান্না করতে পারতাম না। আমার তো আর বসে থাকলে হবে না ছোট ছোট দুটো ভাই বোন আমার দায়িত্বে।

কিন্তু ওখানেও বিপদ। কথায় আছে না, দুচোখ যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়। আমার ও সেই অবস্থা ছিল।

একদিন দুপুর বেলা আমি একটা বাড়িতে কাজ করে ওখানেই একটু বিশ্রাম করে আবার বিকেলে কাজের জন্য বের হই। 

আমি সেদিন রান্না ঘরের এক কোনে শুয়ে ছিলাম আর সেদিন বাড়ির কর্তা, গিন্নি, দুজনে গেছিলেন বাড়ির বাইরে। শুধু বাড়িতে ওনার ছেলে ছিল। 

সেই সুযোগে ছেলেটি আমার কাছে এসে আমাকে রেপ করার চেষ্টা করে। আমি যখন সবাই কে চিৎকার করে বলি, তখন কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে নি উল্টে আমাকে বাজে ভাবে অপমান করে। তার জন্য আমার বাকি কাজ গুলো আমার হাত থেকে চলে যায়। 

সেদিন আমার মনে হলো, এভাবে আমি বাচঁতে পারবো না। তার থেকে ঐ লোকটার প্রস্তাব মেনে নেয়াটাই ভালো, তাতে আমার ভাই বোন ভালো ভাবে বাচঁতে পারবে। আর উনি আর পাঁচজনের মতো আমাকে ছিঁড়ে খাবে না। বলেছিল, রাজি হলে, অনেক কিছু দেবে। তাই না চাইতেও এ বিষ আমি পান করলাম ।

২বছর আগে উনি মারা যান তার পর থেকে আমি এভাবে..... বলেই মাথা নিচু করে। 

আর পাশে বসে থাকা মেয়ে গুলোর কম বেশি এক গল্প। কেউ  কেউ তো ভালোবেসে তার হাত ধরে শহরে এসেছিল, আর সেই তাকে এখানে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। 

সবার সব কথা মনে দিয়ে শুনছিলো সম্রাট।

Comments

Popular posts from this blog

কমলা ভট্টাচার্যঃ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম শহীদ মহিলা কমলা ভট্টাচার্য