অনুবাদসাহিত্য
(মহাকবি ভাসের স্বপ্নবাসবদত্তম নাটক থেকে অনূদিত)
পুরাকালে উদয়ন নামে বৎসরাজ্যে এক অতি বলশালী ওর বীর রাজা ছিল। তাঁর স্ত্রী ছিলেন অবন্তী রাজকন্যা বাসবদত্তা,তিনি ছিলেন অতীব সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী।তাঁকে নিয়ে সুখে কালাতিপাত করছিলেন বৎসরাজ উদয়ন,ইতিমধ্যে তাঁর শত্রু আরুনীকতৃক তাঁর রাজ্যের কিয়দংশ অধিকৃত হয়।তাঁর বিচক্ষণ মন্ত্রী ছিলেন যৌগন্ধরায়ন যিনি স্থির করেন মগধরাজকন্যা পদ্মাবতীর সঙ্গে প্রভুর বিবাহ হলে তাঁর শক্তিবৃদ্ধি হবে, ফলে তিনি বহিঃশত্রুর আক্রমণ রোধ করতে পারবেন,এবং দেবজ্ঞগণও এইরূপ উপদেশই দেন।কিন্তু রাজা উদয়ন তো বাসবদত্তা ছাড়া অন্যকাউকে স্ত্রী বলে স্বীকার করবেন না, অন্তত বাসবদত্তার জীবিত কালে নয়, তাই রানীকে আনুপূর্বিক সব পরিকল্পনা বলে এই বিবাহ ঘটাবার জন্য, রাজার অনুপস্থিতিতে মন্ত্রী রটিয়ে দেন অগ্নিদাহে তাঁর ও রানী বাসবদত্তার মৃত্যু হয়েছে, এবং রানীকে রাজকন্যা পদ্মাবতীর কাছে সখিরূপে গচ্ছিত রাখার জন্য নিয়ে চলেন , নিজের ভগিনী পরিচয় দিয়ে।...
মন্ত্রী যৌগন্ধারায়ন ও রানী বাসবদত্তা দুজনে চলেছেন রাজকন্যা পদ্মাবতীর কাছে।এদিকে যাওয়ার পথে যখন পদ্মাবতী তপোবনে আসছিলেন,তখন তার ভৃত্যবর্গ সবাইকে অর্থাৎ ছদ্মবেশিনি রানী ও মন্ত্রীকেও পথ থেকে সরে যেতে বলল রূঢ়ভাবে,রাস্তা ফাঁকা করে দিতে বলল,রানী এতে মনোক্ষুন্ন হলেন,মন্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দিলেন"মহারানী, আপনিও একদিন রাজমহিষী রূপে সসম্মানে গমনাগমন করবেন, মহারাজ উদয়ন বিজয়লাভের পর অবশ্যই হৃতসৌভাগ্য ফিরে পাবেন, তখন আপনিও আপনার হৃতসন্মান ফিরে পাবেন নিশ্চয়ই, কারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনশীল , এখন শুধু ধৈর্য্য হারাবেন না"।এরপর মহারাজের কান্চুকিয় এসে ভৃত্যাগণকে ত্রাস সৃষ্টি করতে নিষেধ করে ঘোষণা করলেন,"মগধ রাজকন্যা পদ্মাবতী রাজমাতাকে দর্শন করতে তপোবনে উপস্থিত হয়েছেন, তিনি ধর্মপ্রিয়া, তিনি চাননা যে তপস্বীগনের ধর্মকর্মে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করা হোক, ধর্মানুষ্ঠানের জন্য তাঁদের যার যা প্রয়োজন, তিনি তাঁকে সেই বস্তু দান করতে চান।"পদ্মাবতীকে দেখে মত্রীর তাঁর প্রতি ভবিষ্যৎ প্রভূপত্নীরূপে আত্মীয়তা জন্মেছিল ও বাসবদত্তাও তাঁর প্রতি ভগীনিস্নেহ অনুভব করছিলেন এবং ঐ ঘোষণা শুনে মন্ত্রী তার সুযোগ গ্রহণ করলেন ও নিজভগীনি পরিচয়ে বাসবদত্তাকে পদ্মাবতীর আশ্রয়ে গচ্ছিত রাখতে চাইলেন ও দায়িত্ব গুরুভার জেনেও পদ্মাবতী প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন, এতে মন্ত্রী নিশ্চিন্ত হলেন।...
ইতিমধ্যে, এক ব্রহ্মচারী আশ্রমে প্রবেশ করে বললেন,"মহারাজ উদয়ন মহারানী বাসবদত্তার শোকে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছেন তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে।অন্য মন্ত্রীরা তাঁকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে,তাই লাবানক গ্রামে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে,এবং আমিও
তাই ওখান থেকে চলে এসেছি।"যোগন্ধরায়ন জানতে পারলেন উদয়নের বর্তমান অবস্থা এবং অন্য মন্ত্রীরা তার দেখাশোনা করছে জেনে নিশ্চিন্ত হলেন।বাসবদত্তা উদয়নের বর্তমান অবস্থা জেনে কাতর হলেও তাঁর প্রতি উদয়নের ভালোবাসা অনুভব করে প্রীতও হলেন।পদ্মাবতী পত্নীবিয়োগকাতর উদয়নের প্রতি সমবেদনা অনুভব করলেন।...
এরপর যৌগন্ধরায়ান পদ্মাবতী ও অন্য সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং কান্চুকিয় তাঁকে আশ্বাস দিলেন পুনরায় তাদের দেখা হবে, এবং সন্ধ্যাসমাগত দেখে তাঁরা সকলে উপবিষ্টা তাপসীর কাছ থেকে বিদায় নিলেন।....
ইতিমধ্যে একদিন পদ্মাবতীর একজন অনুচর রানী বাসবদত্তাকে পদ্মাবতীর বিয়ের মালা গেঁথে দিতে বললো, বাসবদত্তার দুঃখে হৃদয়বিদীর্ণ হলেও তিনি তা গেঁথে দিলেন।তিনি যে উদয়নকে পুনরায় দেখবার আসতেই জীবনধারণ করে আছেন!ইতিমধ্যে বিদূষক উদায়নকে জিজ্ঞাসা করলেন পদ্মাবতী ও বাসবদত্তার কাছে কে বেশি প্রিয়।উদয়ন উত্তরে বললেন পদ্মাবতী রূপে গুনে তাঁর প্রিয়পাত্রী হলেও বাসবদত্তার স্মৃতি তিনি এখনও ভুলতে পারেননি।অনুচরের মুখেই বাসবদত্তা শুনলেন, উদয়ন স্বয়ং পদ্মাবতীকে বিবাহ করতে চাননি, অন্যপ্রয়োজনে তিনি মগধরাজ্যে এসেছিলেন, মগধরাজ দর্শক, তাঁর উচ্চবংশ,বিশিষ্ট্যজ্ঞান দেখে তাঁকে স্বয়ং জামাতা করতে চান,এতে বাসবদত্তা তাঁর প্রতি উদয়নের প্রেম অনুভব করে আস্বস্ত হন।...
এরপর একদিন পদ্মাবতী শীর্ষ বেদনায় আক্রান্ত হয়ে সমুদ্রগৃহে অবস্থান করছেন,এই সংবাদ পেয়ে উদয়ন তাঁকে সেখানে দেখতে যান,কিন্তু তাঁকে সেখানে না দেখে ক্লান্ত হয়ে শয্যায় ঘুমিয়ে পড়েন।বাসবদত্তাও পদ্মাবতীকে দেখার জন্য সেখানে আসেন এবং অস্পষ্ট দীপালকে উদয়নকে পদ্মাবতী মনে করে তাঁর প্রতি স্নেহবশত শয্যার একপাশে শয়ন করলেন।নিদ্রিত উদয়ন স্বপ্নের ঘোরে বাসবদত্তার নাম ধরে ডেকে উঠলে, তিনি তাদের সব পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে যাবে, এই চিন্তা করে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উদয়নের যে হাতখানি শয্যা থেকে ঝুলে পড়েছিল, সেটি তুলে দিয়ে যেতে গেলেন, কিন্তু দরজায় ধাক্কা খেয়ে তাঁর গতি রুদ্ধ হলো, ঘুমের ঘোরে উদয়ন তাঁকে যেন দেখতে পেলেন।পরে বিদূষককে এই কথা জানালে ,তিনি বলেন এটা তাঁর স্বপ্ন বা দৃষ্টিবিভ্রম।উদয়ন বলেন তাঁর এই স্বপ্ন বা দৃষ্টিবিভ্রম যেন চিরস্থায়ী হয়।...
অবশেষে এসে গেল পদ্মাবতী ও উদয়নের বিবাহের দিন।কত মর্মান্তিক এই দিনটা বাসবদত্তার কাছে!..
এদিকে বাসবদত্তার পিতামাতা নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন বিবাহে, তাঁরা বাসবদত্তার মৃত্যুসংবাদ শুনেছিলেন, জামাতাকে তাঁরা সান্ত্বনা দিলেন ও তাঁর চিত্তবিনোদনের জন্য তাঁকে বাসবদত্তা ও উদয়নের একটি যুগলচিত্র দেখালেন।..
পদ্মাবতী বাসবদত্তার ছবি কৌতূহলবশত দেখলেন ও দেখে বললেন ওই নারী তাদের অন্তপুরেই বাস করেন, তাকে এক ব্রাহ্মণ ভগিনী পরিচয়ে তাঁর কাছে গচ্ছিত রেখেছেন, উদয়ন কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।...
ইতিমধ্যে যৌগন্ধারায়ন ব্রাহ্মণবেশে ভগীনিরূপী বাসবদত্তাকে নিতে এলেন,বাসবদত্তার ধাত্রী তাঁকে দেখেই চিনে ফেললেন,তখন বাসবদত্তা ও যৌগন্ধারায়ন উভয়েই আত্মপ্রকাশ করলেন, উদয়ন ও বাসবদত্তার মিলন হলো।যৌগন্ধরায়ন বাসবদত্তাকে অপসারিত করার জন্য রাজার কাছে ক্ষমা চাইলেন,পদ্মাবতীও তাঁর জ্যেষ্ঠা বাসবদত্তার সঙ্গে সখিরূপ আচরণ করার জন্য ক্ষমা চাইলেন,বাসবদত্তাও তাঁকে সাদরে বরণ করলেন।এরপর তাঁরা সকলে পিতামাতা ও পদ্মাবতীকে নিয়ে অবন্তীরাজ্যে গমন করলেন।...
-সমাপ্ত-
Comments
Post a Comment