ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটার ঘর ছুঁই ছুঁই। শিশির সিক্ত ঘাস- পাতা সূর্যের কিরণে হীরার ন্যায় ঝকঝক করে উঠছে। শীতের উষ্ণতা ভেঙে নীড় ছাড়া হওয়ার পাল্লা পাখিদের। খোকা খুকুরা নীল সাদা ড্রেসে ছুট দিচ্ছে স্কুলের পথে।
তখনও ঘুমে বিভোর ছোটকু।গত রাত্রে বাবা নাকানিচোবানি দিয়েছে। বাজার থেকে সবজির ব্যাগটা নিয়ে বাড়ি আসছিল। তারপর কোন রাস্তার ধারে কোথায় যে ফেলে এসেছে তা আর বলতে পারেনা।এটার জন্যই বাবাকে এত শাসাতে হবে? ছোটকু তা মানতে নারাজ। তাই আধ প্লেট খাবার পেটে না ঢুকিয়েই গর্ গর্ করে উঠে আসে। ঠাস ঠাস শব্দে গেট লাগিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। মা অনেক অনুনয় বিনয় করলেন। কিন্তু ছেলেটা বোকা স্বভাবের হলেও বড্ড জেদী। মায়ের কথায় একটুও ভাবান্তর হলোনা তার ভিতরে।
কোন দিন তাকে ঘুম থেকে জাগাতে হয়না। সকাল হলেই নিজে নিজেই উঠে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসে। অতঃপর স্কুলে যাবার পালা। অথচ আজকে এখন অবধিও সে ঘুমিয়ে। পড়ালেখাও করল না। তবে মতলবটা কী?
মা গিয়ে ডাকেন, কিরে ছোটকু .... আর কতকাল ঘুমাবি? শীঘ্রই ওঠ।
ছোটকু ধরপরিয়ে উঠে বসে। চোখ মলতে মলতে ঘড়ির দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠে।
ওমা! আটটা বেঁজে গেছে।লেপ সরিয়ে দৌড় দেয় কলের দিকে। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বই গুছিয়ে নেয়।
রান্নাঘর থেকে মা হাক ছাড়েন, ছোটকু রে ভাত খেয়ে নিস।
ক্ষুধা অবশ্য লেগেছে ।রাতের কর্মকাণ্ডের উপরে রাগ করে থেকে কোনই লাভ নেই। অশান্ত পেটে কিছু ঢুকিয়ে শান্ত করে নেয়া উচিত। নইলে স্কুলে গিয়েই মাথা ঘোরা শুরু হবে । সময়ও অল্প । বিভ্রান্তে পরে ছোটকু।
খেয়ে নিবে নাকি না খেয়েই দৌড় লাগাবে? মনের সাথে চুকে নিয়ে অবশেষে ভাত খেতে বসে। হোক একটু দেরি ! স্যারকে ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝালেই হবে। সার তো নরম মানুষ ।সাংঘাতিক ভাবে কাউকে পিটুনি দেন না ।যেরকমটা মোটা ম্যাডামের স্বভাব ।একটু ভুল হলেই পিটিয়ে যেন তুলোধুনো করে ফেলেন। সেদিন লালুকে দেওয়া পিটুনির কথা মনে পড়লে আত্মাটা ছ্যাৎ করে ওঠে । বেশি অবশ্য মারেনি। কিন্তু ম্যাডামের রাগী চেহারা দেখে লালু যে মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটিয়েছিল তা মনে পড়লেই ছোটকুর ভিতরে তখনকার ভয়টা এখন চরম হাসিতে পরিণত হয় । ম্যাডামের রাগে ক্লাসে তখন সুনসান নীরবতা।মশা মাছিও যেন উড়ছে না ।উড়লেও পালিয়ে যাচ্ছে জানালা দিয়ে ।কিন্তু একি হলো ! এরকম রাগী চেহারা নিয়েও হঠাৎ ম্যাডাম ফিক্ করে হেসে দিলেন। সবাই তো অবাক! হলো টা কি ? এদিক ওদিক তাকাতাকি করতেই এক পর্যায়ে সবাই খিলখিল করে হাসতে লাগলো । স্তব্ধতার স্থানটা হাসির শব্দে রূপান্তরিত হলো।ছোটকু তখনও ভয়ে কাতর। একটুও হাসছে না । তার মনে হতে লাগলো সকলের সাথে যদি সেও হেসে ফেলে তবে ম্যাডাম সকলকেই পিটুনি দিবেন । কী বিশ্রী কাণ্ডটাই না তখন ঘটবে! কিন্তু ভয়ের কাছে সেদিন ছোটকুকে হার মানতে হয়েছিল । যখন সকলের সাথে সেও লালুর দিকে দৃষ্টিপাত করল। পেটের ভিতর চেপে রাখা ভয়গুলো প্রচন্ড হাসিরুপে বেরিয়ে এলো ।জোরে জোরে শব্দে হাসতে লাগলো ছটকু । আর তখনই ম্যাডাম তাকালেন ছোটকুর দিকে।চোখ দুটো বন্ধ করে মুখটা ইয়া বড় বানিয়ে হাসার চিত্র দেখে জোরে ধমক দিলেন ।
ভয়ে গোটা রুম পুনরায় স্তব্ধতায় নিশ্চুপ হয়ে গেল । ডাগর চোখ দুটো গরম করে বললেন, এই ছেলে মেয়েরা হাসছো কেন ? লালু কি হাসার মতো কোন কাজ করেছে ? হয়তো আমার ভয়ে একটু প্রশাবই করেছে ! তাই হাসতে হবে?
লালুর চেহারাটা তখন দেখার মত ছিল । তার সুন্দর সুশ্রী মুখখানা লজ্জা আর ভয়ে একদম চুপসে গিয়েছিল।
আধঘন্টা সময় ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে ।ছোটকুর খাওয়া শেষ । শীতের জামা কাপড় শরীরে লেগেই আছে । হঠাৎ তার মনে হলো তার যে কলম হারানোর ব্যধি আছে। স্কুলে ভর্তি হবার পর হতে দুটি কলমের কালি শেষ করতে পেরেছে বলে তার মনে হয় না। গতকালও সে কলম হারিয়েছে। আজ যদি স্কুলে কলম ছাড়া যাওয়া হয় তবে পিটুনি একটাও ব্রেঞ্চে পড়বে না ।আর যদি স্কুলেই না যাওয়া হয় তবে পেপারে নিউজ দেওয়ার মতো পিটুনি খেতে হবে।
মায়ের কাছে কলমের টাকা চাইলে কালাই চাচার দোকান হতে বকেয়াতে আনতে বলল । ছোটকু ভৌ দৌড় । দু'দৌড়ে কলম এনেই হাঁসফাঁস শুরু করে। শীতের কাপড় সুদ্ধই দৌড়ানাতে ভ্যাপসা গরমে ইড়িরিড়ি করছে পুরো শরীর । যেন ফ্রিজে ঢুকলেও গা শীতল হবে হবেনা। শীতের সমস্ত কাপড় খুলে স্কুল ড্রেস পরিধান করে । সাইকেলের দিকে এগিয়ে যেতেই চোখ জুড়ে কান্না আসে ।চিৎকার করতে ইচ্ছে হয় ! গলা ফাটিয়ে ।
ক্লাস শুরু হতে বাকি আর মাত্র পনেরো মিনিট। আর এই মুহূর্তে চাকা ফাটা সাইকেলটার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে হবে? এখন কী উপায়? এ সাইকেলে তো যওয়া যাবেই না। তারচেয়ে বরং দৌড়ে গেলে মন্দ হয় না । কাঁধে স্কুল ব্যাগ আর হাতে নতুন কলমটা নিয়ে দৌড় লাগায় ছোটকু । রাস্তা দিয়ে গেলে হয়তো দেরি হবে তাই জমির আইল ধরে এগোতে লাগে। প্রানপনে দৌড়াচ্ছে। চোখদুটো বন্ধ হয়ে আসছে বাতাসের ঝাপটায়।
যাহ্,,,,! এটা একটা হল !
কেন আজকেই তার সাথে এমন হচ্ছে । তার মন চাচ্ছে না সে স্কুলে যাক। কিন্তু সে পিটুনিকে যে বড্ড ভয় পায় । তাই পা ফসকে জমিতে পড়লেও বাড়ি ফিরবার চিন্তা সে মোটেও করছে না। সামনের সেচ মেশিন থেকে জামাতে লাগা কাদা ধুয়ে ফেলে। এবার আর দৌড়ায় না ,ধীর গতিতে চলতে থাকে স্কুলের পথে।
স্যার আসতে পারি ? সব ছাত্ররা হো হো করে হেসে উঠে। ছোটকু কি পাগল হয়ে গেছে? নাকি চশমার প্রয়োজন যা এখনও কেনা হয়নি। স্যারের ক্লাস শেষ। মোটা ম্যাডামের ক্লাস শুরু হয়েছে। টেবিলের সামনের চেয়ারে ম্যাডাম বসেও আছে । আর সে কিনা ডাকছে স্যার বলে।
এই ছোটকু ! ফাইজলামি করছো! এদিকে আসো। মজা দেখাচ্ছি। ছোটকু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ম্যাডামের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ম্যাডাম ভুল হয়েছে । মাফ করে ,,,,,,,।
ঠিক আছে মাফ করা যায় তবে শর্ত সাপেক্ষে ।বাড়ি থেকে করে আনা অংক গুলো দেখাও ।
হালকা হালকা শীতে ছোটকুর শরীর কাঁপছে। গায়ে মাত্র একটা টি-শার্ট ।
ম্যাডামের কথা শুনে কাপাঁকাঁপি যেন দ্বিগুন বেড়ে গেল। বাবার ধমক খেয়ে গত রাতে যে পড়তেই বসেনি । আর খাতা ? তাতো খুলেই দেখেনি ।
:- ম্যাডাম খাতাটা গতকাল পুড়ে গেছে । অংক আমি করেছিলাম বটে ।
:-কেমনে পুড়লো ?
:- মা চিতই পিঠা রেখেছিলেন তাই ।
:- চিতই পিঠা রাখলে কাগজ পুড়ে যায় এতো প্রথম শুনলাম। সত্যি করে বলো কেন অংক করোনি?
:- ম্যাডাম সত্যিই বলছি খাতাটা পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে ।
:-তাহলে এখানেই অংক করে দেখাও ।
ছোটকু পকেটে হাত দেয়। দু'চোখ তার জলে ভরে ওঠে । আছাড় খাওয়ার স্থানে তবে কলমটা হারিয়ে গেল । এখন কি হবে ? ম্যাডাম মিথ্যুক ভেবে নির্ঘাত পিটুনি দিবেন। শীতের দিন ।তারপর আবার শরীরের কোনো শীতের পোশাক নেই । জ্যাকেটটা পড়ে আসলে হয়তো আঘাত বেশি একটা লাগতো না। ভয়ে তার লোম গুলো খাড়া হয়ে যায়।
ম্যাডাম বুঝতে পারে লালুর মতো কোনো দুর্ঘটনা ছটকুও হয়তো ঘটিয়ে ফেলবে । তাই আদর মিশ্রিত কোমল কন্ঠে তাকে কাছে ডাকে। মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়। শীতল কণ্ঠে বলেন ,তোমার জন্য সুসংবাদ রয়েছে।
মলিনতায় ঢেকে যাওয়া ছোটকুর বিষণ্ণ চেহারাটাতে উৎফুল্লতার তরঙ্গ দোলা দেয় ।চোখভর্তি জল নিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে তোলে ।
তখনই হেডস্যার চিকচিক করা লাল কাগজে পেঁচানো ইয়া বড় একটা বক্স হাতে নিয়ে ক্লাসে উপস্থিত হন।
সকলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন:- এটা হলো পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারীর উপহার।
আর তা দেওয়া হবে এবারের ফাস্ট ছাত্র ছোটকুকে।
ছোটকুর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
এ অশ্রুটা খুশির । অনেক্ষণ কষ্টের নদীতে ভাসার পর তীরে ওঠার আনন্দের।
Comments
Post a Comment