দুপুর থেকেই আকাশের মুখটা ভার করে আছে। এখন বিকেল প্রায় সাড়ে ৪টে। মেঘলা ঠাঁই বসে আছে জানালার পাশে সেই কখন থেকে। কোনো এক মেঘলা দিনে জন্ম হয়েছিল বলে বাবা ওর নাম রেখেছিল " মেঘলা "। যাই হোক সে আজ বাড়িতে একা। ওর বাবার অফিসের পিকনিক, সবারই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে যেতে চায় নি কারণ আজ একটা বিশেষ দিন, আর সেই বিশেষ খবরটা পেয়েছে সে আজ সকালেই। তারপর থেকেই কেমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বাইরেটা থমথমে হলেও প্রচন্ড ঝড় উঠেছে তার মনের ভেতর। আর তার সাক্ষী হিসেবে ফোঁটা ফোঁটা করে জল পড়ে চলেছে অনবরত তার চোখ থেকে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না দীপ তাকে এভাবে ছেড়ে চলে যেতে পারে। দীপ্যমান চৌধুরী ওরফে দীপ, একটা মাল্টি সেক্টরে কর্মরত। পরিচয়টা হয়েছিল নেহাতই অনাদরে, এক পরিচিত বন্ধুর সূত্র ধরে। তারপর টুকটাক কথা বলা শুরু। এভাবে কথা বলতে বলতে কখন যে মেঘ মনের অজান্তে দীপকে ভালবেসে ফেলেছে ঘুণাক্ষরেও তের পায় নি। যখন বুঝলো তখন নিজের সর্বনাশ করেই ফেলেছে সে। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের একটু হাসি পেলো। মনে পড়তে লাগলো তার সেই সব মুহূর্তগুলোর কথা। মেঘলাকে মেঘ বলে ডাকার অধিকার ছিল একমাত্র তার বাবার। এই নিয়ে বন্ধুদের সাথেও অনেক বার ঝগড়া করেছে সে। কিন্তু দীপ যেদিন " মেঘ " বলে ডেকে উঠলো সেদিন আর সে বারণ করতে পারেনি। ওই ডাকটাতেই সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। যতই মান অভিমান হোক মেঘ বলে ডেকে কাছে টেনে নিলে সে আর দূরে সরে থাকতে পারতো না। কত রাত পেরিয়ে গেছে তাদের ঐ মান-অভিমানের খেলায়। কত ভালো মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ঐ রাত গুলো। দিনের বেলায় কাজের চাপে বিশেষ কথা হতো না দুজনের। মেঘ ও তখন নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। তাই রাতগুলোই ছিল ভরসা। তবে সারাটাদিন মেঘলা যেটুকু সময় পেত ঐ সময়টুকু ছিল তার নিজের। দীপের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সময়গুলো পেরিয়ে যেত বুঝতেই পারতো না। কোনো কারণে মন খারাপ হলেও ওর কথা ভাবলেই মনটা ভালো হয়ে যেত। অদ্ভুত একটা ভালো লাগার জায়গা ছিল ওটা, যেন সব সমস্যার সমাধান ছিল ওর কাছেই। দীপও তো বলতো সে নাকি চোখ বন্ধ করলেই মেঘকে অনুভব করতে পারে। আরো কত স্মৃতি ভিড় করে আসছে মনে। দীপ কি করে ভুলে গেল সেই দিনগুলো। ওদের ৫ বছরের সম্পর্ক.... এক লহমায় সব মিথ্যে হয়ে গেল ? তাহলে এতদিন ধরে দীপ যা কিছু বলেছে সবই কি মিথ্যে ছিল !! এই এতগুলো বছরে মেঘলা কি চিনতে পারেনি দীপ কে ? তবে যে দীপ বলেছিল সে সব দিন তার পাশেই থাকবে, কোনোদিন তাকে ছেড়ে যাবে না... সেগুলো কি মন ভোলানোর জন্য !!! এতো সব প্রশ্নের ভিড়ে মনটা হু হু করে উঠলো। ভেতরের দলা পাকানো কষ্টটা গলার কাছে মোচড় দিচ্ছে, ওকে ঘিরে ধরছে চারদিক থেকে। আর সে শান্ত হয়ে বসে আছে এখনো জানালার পাশেই। সন্ধ্যে হয়ে গেছে অনেকক্ষন। চারদিকে শাঁখের আওয়াজে ওর হুঁশ ফিরল।
আর কয়েক ঘণ্টা পরেই দীপের বিয়ে, অথচ এমনটা হওয়ার তো কথা ছিল না। কত স্বপ্ন দেখেছিল সে তাদের দুজন কে ঘিরে। অবশ্য ব্যাপারটা খানিকটা এক তরফা ছিল। দীপ কখনোই চায়নি তাদের বিয়েটা হোক। কারণ তার ধারণা ছিল যাকে ভালোবাসা যায় তাকে নাকি বিয়ে করা যায় না। তাহলে ভালোবাসা আর থাকে না, টিপিক্যাল স্বামী-স্ত্রী তে পরিণত হয় সম্পর্কটা। আর তারপর গতানুগতিক জীবন... ঐ ডাল-ভাত-চচ্চড়ি। যেটা মেঘের সাথে নাকি একদম ভাবা যায় না। তাই সে অন্য কাউকে বেছে নিয়েছে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে। কিন্তু তাদের মধ্যে তো কোনো ঝামেলা ছিল না। তাদের ভালোবাসা ছিল ভরপুর, এমন কি তাদের মধ্যে বিশ্বাসও ছিল অটুট। সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল, হঠাৎ কোথা থেকে যেন কি হয়ে গেল !! হঠাৎ একদিন এসে বলল, *আমার বাড়িতে বিয়ের ঠিক করেছে। আমি ওখানেই বিয়ে করবো। পারলে ক্ষমা করে দিও.."
এক মুহূর্তে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছিল। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। আর আজই সেই বিশেষ দিন, দীপের বিয়ে। এখন দীপ কি করছে? নিশ্চয় বরের বেশে টোপর পরে তৈরি বিয়ে করতে যাওয়ার জন্যে ! সে চাইলে দীপের বিয়েটা ভেঙে দিতেই পারতো। কিন্তু কি হবে জোর করে কাউকে আটকে রেখে। বরং সে ভালো থাক নিজের মতো। মেঘ না হয় নিজের মতো কাটিয়ে দেবে জীবনটা তার সুখের স্মৃতি আর অমূল্য ভালোবাসাকে সঙ্গী করে। দীপের কাছে ভালোবাসার মানেটা হয়তো এই রকমই ছিল। কিন্তু মেঘের কাছে ভালোবাসা মানে একটা শান্তি, ভালোবাসা মানে এক মুঠো সুখ, ভালোবাসা মানে সারা জীবনের সঙ্গী, ভালোবাসা মানে............
না থাক, এসব ভেবে আর কি লাভ ! এখন মেঘের কাছে নিজের জীবনটাই ভালোবাসা।
এতো গেল সেদিনের কথা। মাঝখানে কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বছর। মেঘলা এখন একটা অনাথ আশ্রমের সাথে যুক্ত। আগে একটা অন্য শাখায় ছিল। এই কিছুদিন হল মানতপুর এর এই শাখায় সে নতুন এসেছে, এই জায়গাটা বাড়ির থেকে একটু কাছেই হয়। অদ্ভুত জায়গার নাম শুনে ওর মনে একটু কৌতূহল হয়েছিল। পরে এখানে লোকের মুখে শুনেছে এখানে নাকি এক বিশাল বটগাছ আছে। তাতে সুতো বেঁধে যে যা চায় তাই নাকি পায়। ওর অবশ্য এইসব নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না, কারণ সেদিনের পর তার জীবনে কি চাওয়ার থাকতে পারে সেটাই ভেবে দেখেনি। যাই হোক আশ্রমে সবাই খুব ভালো। এই কদিনে কেমন আপন করে নিয়েছে, এমন কি বাচ্চারাও। সারাটাদিন ওদের সাথে কিভাবে কেটে যায় খেয়াল থাকে না। এতগুলো বাচ্চার মধ্যে একটা মেয়েকে দেখে সে অবাক হয়ে যায়। গুঞ্জন, যেমন মিষ্টি নাম তেমনই শান্ত। কথা বলতে পারে না কিন্তু কি সুন্দর ছবি আঁকে। এখানের এক দিদির কাছে সে শুনেছে তার বাবা মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে কিন্তু মাকে কোনোদিন কেউ দেখেনি। ওকে দেখে অবাক হয়ে ভাবে এতো মিষ্টি একটা মেয়েকে কিভাবে এখানে রেখে দিয়ে যেতে পারে! তার যদি এরকম একটা মেয়ে থাকতো !!!
কয়েকটা মাস পেরিয়ে গেছে। হালকা শীতের আমেজ। সেদিন সকালে বাচ্চাদের নিয়ে রোদের মধ্যে বসেই ' বসে আঁকো প্রতিযোগিতা ' হচ্ছিল। সে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিল সবাইকে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা গলার আওয়াজ, " শুনছেন ? " গলাটা শুনে কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে গেলো মেঘলা। সে কি ভুল শুনছে ? পেছন ফিরে তাকাতেই সে বুঝতে পারলো ভুল নয় অবিকল সেই মুখ। সে বিশ্বাস করতে পারছে না দীপ তার সামনে দাঁড়িয়ে। " মেঘ " অস্ফুটে বলে উঠলো দীপ। এতগুলো বছর বাদে নামটা শুনে মনের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠলো। না ভেঙে পড়লে চলবে না, তাকে শক্ত হতেই হবে। একটু সময় নিয়ে বলল " তুমি এখানে ?" দীপ বলল " এখানে আমার মেয়ে থাকে, ওর সঙ্গেই দেখা করতে আসা। " মেঘ কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে জিজ্ঞেস করলো * কে তোমার মেয়ে ? সে এখানেই বা কেন ? " দীপ বলল " গুঞ্জন। আর সে এখানে কেন তার কারণ জানতে গেলে আমাকে একটু সময় দিতে হবে। " মেঘলা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। বলল ওরা আঁকছে তাই আমরা ঐ বেঞ্চটায় বসতে পারি। তারপর সে দীপের মুখে শুনেছিল পামেলা গুঞ্জনকে জন্ম দিতে চায় নি, কারণ সে তার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে পারবে না। পামেলাও মাল্টিসেক্টরে উঁচু পদে আসীন। যদিও বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও গুঞ্জন পৃথিবীতে এল কিন্তু যখন সে জানতে পারলো গুঞ্জন কথা বলতে পারবে না সে আর নিজের কাছে রাখতে চায় নি। এখানে ছেড়ে দিয়ে গেছে। দীপ পারেনি পামেলাকে বুঝিয়ে গুঞ্জনকে বাড়ি নিয়ে যেতে। তাই আসে মাঝে মাঝে দেখা করতে। সব শুনে মেঘলা হতভম্ব হয়ে গেল। কিভাবে একজন মা এরকম করতে পারে ?
সেদিন সবটা শোনার পর সে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিল গুঞ্জনকে। মাঝে মাঝে দীপ আসতো। হঠাৎ একদিন মেঘলা ঠিক করলো গুঞ্জনকে সে দত্তক নেবে। এই কথা দীপকে জানাতে সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। আর কিছু না হোক গুঞ্জন একজন মা পাবে । আর সব চেয়ে বেশি যেটা বুঝেছিল মেঘের চেয়ে বেশি ভালো গুঞ্জনকে কেউ বসতে পারবে না। তাই রাজি না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কথামতো নতুন বছরের প্রথম দিনে সমস্ত সই সাক্ষর করে গুঞ্জনের সব দায়িত্ব মেঘলার হাতে তুলে দিল দীপ। মেঘ গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় তার হাতটা ধরে দীপ বলে উঠলো " জানি আমি অনেক অন্যায় করেছি তোমার সাথে। তার কোনো ক্ষমা হয় না। তাও তুমি আমার জন্যে যা করলে আমি এই ঋণ কখনো শোধ করতে পারবো না। " মেঘ কিছু না বলে আলতো হেসে হাতের ওপর হাতটা রাখলো। এরপর গাড়িতে উঠে গেলো ওরা। গাড়ি চলতে শুরু করল। গুঞ্জনকে নিজের বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে নিজের মনে বলে উঠলো সে " নতুন বছরে এর থেকে ভালো উপহার আমি আর কি বা পেতাম! থ্যাংক ইউ দীপ, সব কিছুর জন্যে। "
Comments
Post a Comment