খ্যাশ - খ্যা---শ -শ ভোঁতা একটা যান্ত্রিক আওয়াজ তুলে রেডলাইনের L ট্রেনটা ইস্পাতের লাইনের উপর দিয়ে বেঢপ সরীসৃপের মতো পেছল দ্রুততার সঙ্গে বেরিয়ে গেল। “ L”মানে শিকাগো ট্রানজিট অথরিটির মেট্রো ট্রেনটা। L শব্দটা আদতে “এলিভেটেডে”র আদুরে ডাকনাম। নামে মেট্রো হলেও এই রেললাইনের খুব কমটাই মাটির নিচে। বাকি পুরো অংশটাই সারসার উঁচু স্তম্ভের উপর দিয়ে আঁকাবাঁকা বিলি কেটে চলেছে শহরের বুক ফালাফালা করে। ব্যতিক্রমী এই রুজভেল্টের মতো খান দুয়েক স্টেশন। আমেরিকার ২৫ তম প্রেসিডেন্ট 'থিওডোর রুজভেল্ট' ক্ষমতায় থাকাকালীন আদতে আমেরিকার কোন উন্নতি সাধন করেছিলেন কিনা সেটা বিতর্ক সাপেক্ষ হলেও, শিকাগোর প্রাণকেন্দ্রে তার নামের স্টেশনখানা কিন্তু বেশ জবরদস্ত। CTA র রেড, গ্রীন আর অরেঞ্জ তিন রকমের ট্রেন লাইন এখানে এসে মেলে। সারাদিনে খুব কম করে কয়েকলাখ মানুষ আর হাজার দুয়েক ট্রেন এই স্টেশন ছুঁয়ে রংবেরঙের ফিতের মতো শিকাগোর উপর দিয়ে চাইনিজ রিবন ডান্স করে চলে দিনভর।
এখন ট্রেন চলে যাবার পর আদুড় ট্র্যাকের গা ঘেঁসে হলুদরঙা লাইন বরাবর দেশভাগের কাঁটাতারের মতো নিষেধের ভ্রুকুটি। তারই থেকে প্রায় ইঞ্চিখানেক দূরে দাঁড়িয়ে অ্যান্ডি ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল সেদিকে। কদিন ধরেই এটা ওর বারেবারেই হচ্ছে। কি যেন ভীষণ জরুরি কিছু ভুলে যাচ্ছে ও। কারও সাথে কথা বলতে বলতে অথবা জরুরি মিটিংয়ের মধ্যে- হঠাৎ করে খেই হারিয়ে যাচ্ছে, থতমত খাচ্ছে। কাউকে বোধহয় কিছু বলার ছিল- সেইটা ঠিক যেন পেটে আসছে, মুখে আসছে না। আর মনে করতে না পারা পর্যন্ত ভেতরে কেমন যেন একটা ঢেঁকুর চাপা অসোয়াস্তি।
এই যে মহানগরের স্টেশন বেয়ে ওর পাশ কাটিয়ে হাজারে হাজারে দৌড়ে চলেছে- নানাভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের মানুষ, তারাই কি সবাই ছাই জানে ঠিক কোনটি চাই তাদের? ঠিক কোনটি প্রাপ্তির জন্যে জীবনে এই অক্ষয় ছুটে চলা- উন্মাদ ব্যস্ততা? আর শুধু এই মহানগরের কোথায় বা বলি কেন? পৃথিবীর সব মহাদেশের সব মহানগরেই বোধহয় মানুষের বড্ড ব্যস্ততা, বড্ড তাড়াহুড়ো থাকে। বিরক্ত তিতকুটে মুখে অসংখ্য মানুষের ঢল ছুটে চলে আরও একটু বেশি সঞ্চয়ের, আরও একটু বেশি ভালো থাকার জন্যে। আসলে এই " ভালো থাকা" শব্দটা আবার ভীষণ স্ব-বিরোধী। অনেকটা "ভালো বাসা" শব্দটার মতোই। মানুষ কি সারাজীবনে কখনও নির্ভুল ভাবে জানতে পারে সত্যি কিসে ভালো থাকা যায়।
বেশিক্ষণ অবশ্য ভাবার দরকার পড়ল না। ট্রেন থেকে নামা জনস্রোত অ্যান্ডিকে একরকম ঠেলেই নিয়ে চলল বাইরের দিকে। দিশেহারা মুখে সেই চলমান জনস্রোতের ঠেলায় স্বয়ংক্রিয় ভাবে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই পূর্বজন্মের স্মৃতির মতো অ্যান্ডির মনে পড়ে গেল- আরে হ্যাঁ, ঠিক এটাই তো করার কথা ছিল। ট্রেন থেকে নেমে এস্কেলেটর ধরে বাইরে যাওয়া। অথচ তখন থেকে কেন যে শুধু মুদু ........
শিকাগোর অ্যান্ডি পূর্ণাঙ্গে আদতে মেদিনীপুরের তালগোবরা গ্রামের অনাথবন্ধু রায়, বন্ধুমহলে অপভ্রংশে অনু। ছ ফুট ছোঁয়া টানটান নির্মেদ চেহারা। রঙটা বাঙালিদের তুলনায় একটু চাপার দিকে মনে হলেও, এই শহরের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের যদি ধরা হয় তবে একেবারে পাকা গমের মতো রং ওর। এস্কেলেটর দিয়ে বাইরে এসে পৌঁছাতেই মিড- ওয়েস্টের ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া মুখের উপর সপাটে একখানা চড় কষালো। আর সেই হাড়বজ্জাত হাওয়া ওর ফুলহাতা ব্রাউন পুলওভার ভেদ করে মেরুদন্ড অবধি কাঁপিয়ে দিল। টুপি গ্লাভ্স পরেও ঠান্ডায় আপাদমস্তক কেঁপে উঠল অ্যান্ডি ।
রুজভেল্ট স্টেশনের ঠিক বাইরের রাস্তাটার নামও প্রেসিডেন্টের নামেই - রুজভেল্ট এভিনিউ। মিচিগান হ্রদের পাশ বরাবর নাছোড়বান্দা প্রেমিকের মতো লেকশোর নামের যে রাস্তাটা লেকের পিছুপিছু ফ্যা ফ্যা করে চলে এসেছে একেবারে এই রুজভেল্ট এভিনিউ অবধি; তারই উত্তর কোনে অ্যান্ডির এক কামরার এপার্টমেন্ট। যাতায়াতের দূরত্বটা অনেকখানি হলেও ঘর ভাড়া হিসেবে সস্তা পড়ে বেশ খানিকটা, উপরন্তু অজন্তার জন্যেও সুবিধা হয়। অ্যান্ডির অর্থপেডিক রেসিডেন্সির এটাই ফাইনাল ইয়ার। গত পাঁচ বছরের অমানুষিক পরিশ্রমের পর কোনমতে চোখকান বুঁজে এই বছরটা টেনে দিতে পারলেই- সুড়ঙ্গের শেষে রোদ্দুর। পড়াশুনোয় মাথা ওর চিরকালের পরিষ্কার। খাতায় কলমে নম্বরও মন্দ নেই। সত্যি বলতে পশ্চিম মেদিনীপুরের অজ পাড়াগাঁয়ের ভেতর থেকে এই শিকাগোর সফরটা তো খুব একটা সহজ ছিল না ওর জন্যে। বরং বলতে গেলে অনেকটা গল্প কথার মতোই শোনাতে পারে। কোনমতে এই বছরটা পার হলেই সরকারী বা বেসরকারী হাসপাতালে মোটা মাইনের একটা চাকরি জুটিয়ে ও নিতে পারবেই এটুকু ভরসা অ্যান্ডির নিজের উপর আছে। চাকরিটা পেলে তখন ছুঁয়ে দেখতে পারবে অনেক না পাওয়া স্বপ্নকে। কে জানে আস্তিনের তলায় লেগে থাকা এত বছরের অপমানের কালশিটেগুলোও হয়তো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসবে। তাই গত পাঁচ বছর ধরে সপ্তাহে ছ দিন এটাই অ্যান্ডির বাঁধা ধরা রুটিন। প্রতিদিন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাতটায় রেডলাইনের l থেকে নেমে এস্কেলেটর বেয়ে বাইরে এসে ১২ নম্বর বাস ধরে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। অথচ সেই সাধারন কাজ টুকুই কেমন যেন ঘেঁটে গেল আজ।
রুজভেল্ট এভিনিউ এর উপরে মুখোমুখি দুটো দোকান - এক দিকে ওয়ালগ্রিনের মাল্টিস্টোর সুপারমার্কেট। দোকানের কাঁচের দেওয়াল খ্রিস্টমাস সেলের পোস্টারে পোস্টারে ছয়লাপ....সিনামন ফ্লেভার ক্রিম থেকে আরম্ভ করে আপেল পাই ফ্লেভার কন্ডোম অবধি সবেই সেল সেল! দোকানের সারিতে ছাড়ের ট্যাগ গায়ে জড়িয়ে থরে থরে অপেক্ষায়......হাতছানির ইশারায় শুধু কিনে বাড়ি নিয়ে যাবার অপেক্ষা। অন্যান্য দিন বাস এসে পৌঁছানোর আগে অবধি সময় কাটানোর জন্যে অ্যান্ডি উইন্ডোশপিং করে। অথবা মাথার মধ্যে অদৃশ্য লিস্টে টুকে রাখে ফিরতি পথে কেনার জন্যে টুকটাক গেরস্থালির সরঞ্জামের নাম, কদাচিৎ অজন্তার জন্যে খুচরো উপহার। আজ সেদিকে তাকানোর ইচ্ছেটুকুও নেই।
উল্টোদিকে স্টারবাকসের কফির দোকান। প্রতিদিন সকালে ফ্রেশ ব্রিউড কফি - এক্সপ্রেসো, কলম্বিয়ান ডার্ক রোস্ট, ক্যাপুচিনো, আমেরিকানো, ল্যাটে আরো কত রকমের সুগন্ধে চারিদিক মম করে। এই সময়টা অ্যান্ডির বেশ প্রিয়। ঘ্রাণেন অর্ধভোজনেই বেশ চনমনে লাগতে থাকে নিজেকে। আজ গন্ধটা নাকে লাগতেই পেটের ভিতরটা ঘুলিয়ে উঠলো। তখনই মনে পড়ে গেল কাল দুপুরের পর থেকে পেটে এক বিন্দু জলও পড়েনি এখনও।
(চলবে.....)
Comments
Post a Comment