#গুরুমা #
✍পূবালি রায় (পিংকি )
"যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ
কেহ কভু তাদের করেনি সম্মান।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -
বাইশ বছর আগে যখন আমি নবম শ্রেণিতে, তখন স্কুলে আমাদের গুরুমার মুখ থেকেই প্রথম শুনে ছিলাম এই কথাগুলো এবং তা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম তাঁরই শিক্ষায়। স্কুল জীবনে আমার গুরুমা প্রীতি মুখার্জীকে শিক্ষিকা রূপে পেয়েছিলাম এমনই এক বসন্তের দিনে। তিনি আমাদের বাংলা ও ইতিহাস পড়াতেন। তাঁর পড়ানোর মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। মাত্র দুটি বছর তার সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তারপর আমি সেই স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে চলে যাই অন্য উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে। কিন্তু ওই দুটি বছরের পর আমার জীবনে একটা বিরাট পরিবর্তন দেখা দিল, ওঁর শেখানো জীবন দর্শনের নিরিখে। আজ আমি একজন শিক্ষিকা। আমার সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের তাঁর গল্প বলি। তিনি স্বমহিমায় আমার মতো অজস্র ছাত্রীদের মণি কোঠায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপে বিরাজমান।
তিনি স্কুলে ছাত্রীদের কাছে নিজেকে এক কঠিন আবরণে আবৃত করে রাখতেন। কিন্তু তার সেই কঠিন আবরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকত অপত্যস্নেহের ফল্গু ধারা , ওঁর চোখ দুটো ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও বুদ্ধিদীপ্ত। যেন ঐ চোখ দুটো মানুষের অন্তর অবধি পড়তে জানে। আমার মতো হাজারো ছাত্রী তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ে তুলেছে। তাঁর দেওয়া শিক্ষা ও আদর্শ আজও আমাদের জীবনে অঙ্গাঙ্গী ভাবে মিশে রয়েছে। তিনি ছিলেন আমাদের স্কুলের মেরুদণ্ড। তবে তিনি স্কুলে ছাত্রীদের কাছে "বাংলার বাঘ " বলেই সমধিক খ্যাতি অর্জন করে ছিলেন। আমার আজও মনে পড়ে তাঁর বাঘের মতো শীতল চাওনি। তিনি ছাত্রীদের মঙ্গলার্থেই নিজেকে কঠিন আবরণে আবৃত করে রাখলেও ছাত্রীদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের কোনো কমতি ছিল না। সকলের মনে তাঁর প্রতি ছিল ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা।
এ আমার পরম সৌভাগ্য যে,তাঁর জীবন সম্পর্কে যেটুকু জেনেছি তা সকলের সমক্ষে তুলে ধরতে পারছি।
তিনি আজ আশি উর্ধ্বা। তাঁকে আজীবন একজন সৎ- কর্তব্যপরায়না- দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় যুক্ত একজন যোদ্ধা রূপেই দেখেছি। জীবনের এতো গুলো বছর পেরিয়েও তিনি আজও নিরলস ভাবে কর্মে নিযুক্ত। এখনও একই ভাবে প্রাণোচ্ছল - প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর।
আমাদের গুরুমা অর্থাৎ প্রীতি মুখার্জী স্বনামধন্য চিকিৎসক শ্রী পাঁচুগোপাল মুখার্জীর কনিষ্ঠতমা কন্যা। যিনি ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে জীবনারম্ভ করেন নীলরতন হাসপাতাল থেকে, যা ছিল তখন ক্যাম্বেল নামে পরিচিত। তারপর 1943 সাল থেকে তিনি দার্জিলিং এ চিকিৎসক হিসেবে আট বছর অতিবাহিত করেন। এই দার্জিলিং এই স্বাধীনতার প্রাক্কালে 1945 সালে আমাদের গুরুমার জন্ম। তারপর ডঃ পাঁচুগোপাল মুখার্জী বদলি হয়ে যান অ-বিভক্ত বাংলার রাজশাহীতে। এছাড়া তিনি চিকিৎসা জগতে Anotomic Teacher ছিলেন। তাঁর হাত ধরে বহু ছাত্র চিকিৎসা জগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
সেই সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার সূর্যালোকে বড় হতে থাকেন আমাদের গুরুমা। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতমা। পাঁচ ভাইবোনের মাঝে বড় আদরে বড় হতে থাকেন তিনি। ছোটো থেকে ই তিনি ছিলেন যথেষ্ট মেধাবী। পড়াশোনা ছাড়াও তাঁর গান ও বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ছিল বিশেষ আগ্রহ। সবসময় তিনি নতুন কিছু শেখার মধ্যে দিয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে ভালোবাসতেন। কলা বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করলেও পিতার কাছে জীববিদ্যা নিয়ে চলত নানা বিষয়ে আলোচনা। 1960 সালে তিনি কালনার হিন্দুগার্লস স্কুল থেকে H.S সাম্মানিক নম্বর নিয়ে পাশ করে বর্ধমানের রাজ কলেজ থেকে 1963 সালে বাংলা অনার্সে আশানুরূপ ফলাফল করেন। এরপর 1968 সালে নবদ্বীপ সংস্কৃত কলেজ থেকে সংস্কৃতে আদ্যোপান্ত করেন। তারপর তিনি 1970 সালে B.T করেই কালনা শশীবালা গার্লস স্কুল থেকেই শিক্ষকতা জীবনে পদার্পন করেন। তখন তাঁর বেতন ছিল মাত্র পঞ্চাশ টাকা। পাশাপাশি সেলাই শেখা- ফার্স্ট-এইড ট্রেনিং ব্রতচারি শিক্ষাও নিতে থাকেন তিনি। এরপর তিনি শ্রীমান আনন্দমোহন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আনন্দমোহন বাবু দুর্গাপুরে Central Mechanical Engineer Reasarch Institutions এ পার্চেস অফিসার ছিলেন। আমাদের গুরুমা প্রীতি দিদি শুধু যে একজন আদর্শ শিক্ষিকা ছিলেন তাই নয়। পাশাপাশি তিনি ছিলেন যোগ্য সহধর্মিণী। অসুস্থ শাশুড়িমায়ের সেবার সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির প্রতি ছিলেন যথেষ্ট কর্তব্য পরায়ণা। তিনি অবসর সময় কাটাতেন বিভিন্ন লেখকদের বই পড়ে কিংবা গানের রেওয়াজ করে। এমনকি এই বয়সেও তিনি সাবলীল ভাবে গীটারও হস্তসঞ্চালন করেন । ওঁর যে কেবল বাংলা সাহিত্যেই অগাধ জ্ঞান ছিল তা নয়-ইতিহাসে,ভূগোলে ও জীবন বিজ্ঞানেও ছিল যথেষ্ট দখল। স্কুলে বাংলা ইতিহাস ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিতে খেলার ক্লাস, ওয়ার্কেডুকেশন এমনকি সময় অসময়ে ভূগোল ও জীবন বিজ্ঞানও পড়িয়ে পড়ুয়াদের হৃদয় স্পর্শ করেছেন।
তিনি কেবল শিক্ষিকা হিসেবে নন একজন আদর্শ মানুষ রূপেও অনন্যা। তিনি সব সময় ছাত্রীদের লক্ষ্য রাখতেন। অনেক সময় কোনো ছাত্রী অর্থাভাবে বা পারিবারিক সমস্যার কারণে টিফিন না আনলে তিনি সেই ছাত্রীর টিফিনের ব্যবস্থাও করে দিতেন। কখনও বা কারুর আর্থিক কারনে খাতা বইর অভাবে হলে সবার অজানতে তাকে সাহায্যও করেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পরে গেল। আমি তখন দশম শ্রেণিতে। আমাদের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির একটি ছোট্ট মেয়ে শীতের দিনে প্রায়শ স্কুলে অনুপস্থিত থাকত। দিদির নজরে পড়লে তাকে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন। এতো কামাইয়ের কারণ কি? তখন মেয়েটি সভয়ে জানায় তার একটি ছোট্ট ভাই আছে যে ঐ স্কুলেরই প্রাইমারি তে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তার বাবার সামর্থ নেই দুই ভাইবোনকে তিনি দুটো সোয়েটার কিনে দেবেন। তাই যে দিন ভাই সোয়েটার পড়ে স্কুলে যায় সেদিন ঐ মেয়েটি স্কুল কামাই করে। আবার যে দিন মেয়েটি সোয়েটার পড়ে স্কুলে যায় তখন ভাই কামাই করে। এই ভাবেই নিজেদের বোঝাপরার মধ্যে দিয়ে তাদের শীতকালীন স্কুল জীবন চলছে। আমাদের কোমল হৃদয়া দিদি তখন মেয়েটির বাবার অনুমতি নিয়ে মেয়েটিকে একটি সোয়েটার কিনে দেন। এছাড়াও অনেক ছাত্রীদের আর্থিক ভাবে পড়াশোনার জন্য সাহায্যও করতেন যাতে তাদের অর্থাভাবে স্কুল জীবনে ছেদ না পড়ে। শিক্ষিকার র্কমজীবন থেকে 2001 সালে অবসর গ্রহণ করলেও তিনি থেমে থাকেননি। তার কর্মের প্রতি নিষ্ঠা - সততা ও বিচক্ষণ দৃষ্টি শক্তির জন্য কালনায় 2003 সালে একটি গোষ্ঠি ব্যাঙ্কে তিনি একজন কর্মীর পদ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত হন। আজও তিনি নিরলস ভাবে সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাঁর বহিরাবরণে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও তিনি অন্তর থেকে আজও সতেজ চির বসন্তের মতো। তাঁর সুস্থতা আমি সবসময় কামনা করি। আমাদের গুরুমা আমাদের মতো বহু ছাত্রীদের প্রেরণা ও পথ প্রদর্শক। ------
ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব।
ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।
ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব।
ত্বমেব সর্ব্বং মম দেবদেব।।
Comments
Post a Comment